Full transcript
0:03কল্পনা করুন ভোরবেলা নির্জন একটা সৈকত
0:06ঢেউের সাথে ভেসে এসেছে বিশাল কিছু একটা
0:10রুপালী আয়নার মত চকচকে লম্বাই 8 মিটার
0:14মাথায় আগুন লাল একটা ঝুটি দেখতে ঠিক যেন
0:17একটা মুকুট পৃথিবীর কোন বইয়ের ছবির সাথে
0:21এটা মেলে না।
0:25আর অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো শত শত বছর ধরে
0:28মানুষ এই প্রাণীটাকে এভাবেই চিনেছে মরা
0:31অবস্থায়।
0:35সমুদ্রের যে গভীরতায় সে থাকে সেখানে
0:39মানুষের চোখ পৌঁছায় না। তাই দেখা হওয়ার
0:42একটাই উপায় ছিল। যখন সে মরতে মরতে উপরে
0:45উঠে আসতো কিংবা পুরোপুরি মরে ভেসে আসতো
0:48তীরে।
0:52এর নাম ওরফিশ। পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা
0:56হাড়ওয়ালা মাছ।
0:59নামের পিছনেও একটা মজার ভুল আছে। লম্বা
1:02পাখনা দেখে মানুষ ভাবতো মাছটা বুঝি বইঠা
1:05বেয়ে পানিতে চলে। ধারণাটা পরে ভুল
1:07প্রমাণিত হয়। কিন্তু নামটা থেকে যায়।
1:22মধ্যযুগের নাবিকরা একে ডাকতো সি সারপেন্ট
1:26মানে সমুদ্রের সাপ। তাদের গল্পে এই প্রাণী
1:29জাহাজ পেঁচিয়ে ধরে টেনে নামিয়ে নিত
1:32পানির নিচে। জাপানে তার পরিচয় আরো ভারী।
1:35সেখানে একে ডাকা হয় রিগুইনসুকাই। মানে
1:38ড্রাগন রাজার প্রাসাদ থেকে আসা
1:41বার্তাবাহক। আর সে যে বার্তা নিয়ে আসে
1:44সেটা কেউ শুনতে চায় না। জাপানিরা বিশ্বাস
1:47করতো বড় কোন বিপর্যয়ের আগে এই মাছ তীরে
1:50ভেসে আসে। এর আরেকটা নামও আছে কেয়ামতের
1:54মাছ। আর এখান থেকেই গল্পটা গাশিরশির করা
1:57জায়গায় ঢোকে। 2009 আর 2010 সালে জাপানের
2:01উপকূলে 20 টা ওরফিশ ভেসে আসার খবর পাওয়া
2:04যায়।
2:062011 সালে আঘাত হানে তোহকু ভূমিকম্প।
2:09জাপানের ইতিহাসের সবচাইতে শক্তিশালী
2:12ভূমিকম্প। এর ধাক্কায় তৈরি হওয়া
2:14সুনামিতে প্রাণহারায় বা নিখোঁজ হয়
2:17প্রায় 18,500 মানুষ। এরপর মানুষ আবারো
2:21পুরনো বিশ্বাসটার কথা মনে করল। আজগুলো কি
2:24সত্যিই আগেই জানতো বিজ্ঞানীরা কিন্তু এত
2:27সহজে মানতে রাজি হননি। কারণ পাশাপাশি
2:30দুইটা ঘটনা ঘটলেই একটা আরেকটার কারণ হয়ে
2:33যায় না। ওরফিশ সাধারণত উপরে উঠে আসে অন্য
2:37কারণে।
2:40যখন সে অসুস্থ আহত কিংবা মৃত্যুর কাছাকাছি
2:44তবুও প্রশ্নটা ঝুলেছিল।
2:472019 সালে জাপানের একদল গবেষক ব্যাপারটা
2:50সরাসরি যাচাই করতে বসেন।
2:59কয়েক দশকের গভীর সমুদ্রের মাছ দেখতে
3:02পাওয়ার শত শত ঘটনা তারা মিলিয়ে দেখেন
3:04ভূমিকম্পের রেকর্ডের সাথে। পুরো তালিকায়
3:07মিল পাওয়া গেল মাত্র একটা। হাজার বছরের
3:10একটা বিশ্বাস সংখ্যার সামনে দাঁড়িয়ে আর
3:13টিকতে পারলো না। কিন্তু গল্পটা ভেঙে
3:15যাওয়ার পর আসলে প্রাণীটা ছোট হয়ে
3:18যায়নি। বরং আরো রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
3:21কারণ গল্পের চেয়েও অদ্ভুত ছিল আসল মাছের
3:24ঘটনা।
3:27একটা ঘোড়ার মত লম্বাটে মুখ। মাথার উপর
3:30থেকে উঠে আসা আগুন লাল একটা ঝুঁকি। দেখতে
3:34ঠিক যেন মুকুট। শরীরে কোন আশ নেই। কাছে
3:38আছে আয়নার মত একটা রূপালী আস্তরণ। যেটা
3:41উপর থেকে আসা যেটুকু আলো পায় সেটুকুই
3:44ফিরিয়ে দেয়।
3:56ওজন হতে পারে 272 কেজি পর্যন্ত। মানে
4:00চারজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সমান। আর আসল
4:03অদ্ভুত ব্যাপারটা তার সাতারে।
4:10পৃথিবীর প্রায় সব মাছ সাতার কাটে শুয়ে
4:13সোজা সামনের দিকে। ওরফিশ সাতার কাটে খাড়া
4:17হয়ে মাথা উপরের দিকে লেজ সোজা অন্ধকারের
4:20দিকে ঝোলানো।
4:26কেন সেটা আজও কেউ পুরোপুরি জানে না। এই
4:29প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নামতে হবে সেই
4:31জায়গায় যেখানে সে সারাজীবন কাটায়।
4:40সমুদ্রের উপরের 200 মিটার পর্যন্ত সূর্যের
4:43আলো পৌঁছায়। তার নিচ থেকে শুরু হয়
4:46গোধুলি স্তর। 200 থেকে 1000 মিটার। এখানে
4:50আলো এতটাই কম যে কোন গাছপালা বাঁচতে পারে
4:53না। আর একটা নির্দিষ্ট গভীরতার পর প্রায়
4:56পুরোপুরি অন্ধকার শুরু হয়ে যায়।
5:01পানির চাপ এমন যে সুরক্ষা ছাড়া কোন মানুষ
5:05এক মুহূর্তও টিকবে না। কিন্তু সবচেয়ে
5:08অদ্ভুত ব্যাপারটা চাপ বা অন্ধকার না।
5:11এখানকার পানি এতটাই স্থির, এতটাই স্রোতহীন
5:14যে লাখ লাখ বছর ধরে এখানে থাকা প্রাণীটার
5:17কোন শক্ত পেশে বানানোর দরকারই হয়নি।
5:27ওরফিশ আক্ষরিক অর্থেই একটা নিস্তব্ধতার
5:30প্রাণী। এখন ভাবুন এই বিশাল অন্ধকার
5:33বৈশিষ্ট্যহীন পানির ভেতরে একটা নির্দিষ্ট
5:36মাছ খুঁজে বের করার কথা। এজন্যই 2শ বছরেও
5:40দেখা পাওয়ার সংখ্যাটা এত কম।
5:541771 সালে নরওয়ের এক সৈকতে ভেসে আসা একটা
5:59মৃতদেহ থেকে প্রথমবার এই মাছের বৈজ্ঞানিক
6:02বর্ণনা লেখা হয়। তারপর আজ পর্যন্ত
6:05পৃথিবীর সব উপকূল মিলিয়ে ওরফিশ তীরে ওঠার
6:08নথিভুক্ত ঘটনা 250রও কম। 8 মিটার লম্বা
6:13একটা প্রাণীর জন্য এই সংখ্যাটা বিশ্বাস
6:16করা কঠিন।
6:212013 সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাটালিনা
6:24দ্বীপের কাছে সাড়ে মিটার লম্বা একটা
6:27ওরফিশ তীরে উঠে আসে। মৃত শরীরটা পানি থেকে
6:30টেনে তুলতে লেগেছিল 15 জন মানুষ।
6:35কিন্তু মরা শরীর যা বলতে পারে তারও একটা
6:38সীমা আছে। সে বলতে পারে না প্রাণীটা
6:41কোথায় ডিম পারে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিভাবে
6:44পথ চেনে কি খায় কতদিন বাঁচে আর এই
6:48প্রশ্নগুলোই ঝুলেছিল 150 বছর ধরে
6:572014 সালের শীতে দক্ষিণ জাপানের উপকূলে এক
7:01ডজনেরও বেশি তাজা ওরফিশ ভেসে আসে একটা
7:05দুইটা না কয়েক মাসের ভেতরে এতগুলো
7:07বিভিন্ন সাইজের প্রথমবারের মতো
7:10বিজ্ঞানীদের হাতে যথেষ্ট নমুনা আসে আর
7:13তারা যন্ত্র দিয়ে শরীরের ভেতরটাও দেখে
7:15ফেলে। যা বের হয় তা তারা আশা করেনি। 8
7:18মিটার লম্বা এই প্রাণীটার মগজ মাত্র এক
7:21ইঞ্চির মত। তাহলে গোটা ওই শরীরটা চালাচ্ছে
7:25ওই এক ইঞ্চি। আর নাক দশকের পর দশক ধরে কেউ
7:29ওরফিশের নাক খুঁজেই পায়নি।
7:36এক্সরেতে ধরা পড়ে নাকটা মুখের একেবারে
7:39সামনের ডগায়। আর খুলেছে ভেতরের দিকে
7:42গিয়ে। মানে গন্ধ পেতে হলে মাছটাকে সাঁতার
7:45কাটতে হয় হা করে। মুখের ভেতর দিয়ে পানি
7:48টেনে। অন্ধকারে কোন চিহ্ন ছাড়া এক ইঞ্চি
7:51মগজ নিয়ে সে শুধু মাথা ঘুরিয়ে বুঝে নেয়
7:54যে গন্ধটা কোন দিক থেকে আসছে।
7:59এত কিছুর পরেও একটা জিনিস বাকি থেকে যায়।
8:02জ্যান্ত মাছটা আসলে কি করে কেউ দেখেনি।
8:06সেই দেখাটা হয়েছিল একেবারে
8:07দুর্ঘটনাক্রমে।
8:092000 সালের গরমে ফ্রান্সের উপকূল থেকে
8:12প্রায় 65 কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে একটা
8:15বৈজ্ঞানিক বয়া বসানো হয়। কাজটা ছিল সহজ।
8:18কিন্তু সমুদ্র আমাদের পরিকল্পনা মেপে চলে
8:21না। বয়াটার কাঠামো, শেকল আর ছায়া মিলে
8:24আশপাশের পানিটাই বদলে দিতে থাকে।
8:30শেওলা জমে ছোট মাছ আসে। তারপর আসে বড়
8:33মাছ। একটা যন্ত্র ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে
8:36ভাসমান একটা ছোট জগত। প্রতিমাসে একজন
8:39ডুবুরি নামতেন বয়ার সেন্সর পরিষ্কার
8:42করতে।
8:49ব্রাশের ঘসায় তৈরি হওয়া কম্পন তারের
8:51ভেতর দিয়ে নিচের দিকে নেমে যেত। আর
8:54পানিতে শব্দছড়ায় বাতাসের চেয়ে
8:56ভিন্নভাবে। এমনি একদিনে নিচের অন্ধকার
8:59থেকে উঠে এলো জ্যান্ত এক ওরফিশ।
9:03মানুষের ইতিহাসে সেই প্রথম কেউ পানির নিচে
9:06এই প্রাণীটার মুখোমুখী হয়। কিন্তু একবার
9:09দেখা আর ভালো করে দেখা এক জিনিস না।
9:17স্কুবা ট্যাংক থেকে অনবরত বুদবুদ বের হয়।
9:20আর যে প্রাণী জীবনে বুদবুদ দেখেনি
9:23ওইটুকুতেই সে অন্ধকারে ফিরে যায়। শেষমেষ
9:27বুদবুদহীন শ্বাসযন্ত্র নিয়ে নামার পর
9:29প্রায় পাঁচ মিটারের একটা ওলফিশ যথেষ্ট
9:32সময় সামনে থাকলো।
9:41মাছটা ভেসে ছিল না। সে নিজেকে চালাচ্ছিল।
9:45শরীর প্রায় নিশ্চল খাড়া। মাথা উপরের
9:47দিকে। নড়ছিল শুধু পিঠের ওই লম্বা
9:50পাখনাটা। অন্ধকারে ঢেউ তোলা একটা ফিতার
9:54মতো। সামনে পেছনে উপর নিচে।
10:03আর এই প্রাণী শুধু জাপান বা ভূমধ্যসাগরের
10:06গল্প না। 2021 সালে শ্রীলংকার পশ্চিম
10:09উপকূলে টোনার জালে উঠে আসে একটা ওরফিশ।
10:13গ্রীশবমন্ডলীয় ভারত মহাসাগরে প্রথম
10:16নিশ্চিত রেকর্ড। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত
10:19জিনিসটা লুকিয়েছিল ক্ষতের ভেতরে। যত
10:22ওরফিশ দেখা গেছে প্রায় সবগুলোরই ছিল
10:25লেজের অংশ কাটা। ধরে নেওয়া হয়েছিল বড়
10:27কোন শিকারীর কাজ। কিন্তু প্রমাণ মিলছিল
10:31না। এত বড় মাছের শিকারী নিশ্চিত হাতে
10:34গোনা। হাঙ্গরের আক্রমণের নথি একটাও নেই।
10:38তাহলে লেজ গেল কোথায়? উত্তরটা কেউ আশা
10:41করেনি। ওরফিশ নিজের শরীরের অংশ নিজেই
10:45ছেড়ে দেয়। একবার না বারবার। উদ্দেশ্য
10:49পালানো না উদ্দেশ্য শক্তি বাঁচানো শরীর যত
10:53ছোট হয় বেঁচে থাকার খরচও তত কমে
10:57জন্মের গল্পটা আরো নিষ্ঠুর 2019 সালে
11:01ওকিনাওয়ার কাছে জালে ওঠা দুইটা ওরফিশ
11:04থেকে প্রথমবারের মত ডিম মেলে টকটকে লাল
11:07ভাসমান প্রায় 400 ডিম রাখা হয় ট্যাংকে
11:11সাগরের বেশিরভাগ মাছেরই ডিম ফোটে এক থেকে
11:14তিন দিনে ওগুলো ফুটতে লেগে গেল 18 দিন
11:18তারপর বাচ্চাগুলো ফুটে এমন কিছু করল যার
11:21ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই।
11:26তাদের মুখ পুরোপুরি কাজ করছিল। তবুও তারা
11:30কিছু খেল না। পুরো সময়টাই তাদের মুখ
11:32খুলেছিল মাত্র ছয়বার।
11:35চার দিনের ভেতরে একটাও আর বেঁচে ছিল না।
11:39বন্য অবস্থায় ওরফিশের বাচ্চা কি খায় আজও
11:42কেউ জানে না।
11:47গভীর সমুদ্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
11:50আবাসস্থল।
11:52অথচ চাঁদের পিঠের চেয়েও কম দেখা। ওই
11:55অন্ধকারে যারা আছে তারা আমাদের খুঁজে
11:58পাওয়ার অপেক্ষায় বসে নেই। লাখ লাখ বছর
12:00ধরে যেভাবে চলছিল ঠিক সেভাবেই চলছে।